:

নির্ভরতা কমানোর ডাকের মধ্যেই ভারত থেকে আমদানি প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৭.৮৩ শতাংশ

top-news

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, কূটনৈতিক টানাপড়েন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভারত বর্জন’ বা ভারতীয় পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমানোর জোরালো ডাক সত্ত্বেও উল্টো চিত্র দেখা গেছে বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক নির্ভরতা না কমে বরং বেড়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য আমদানির প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে ভারত থেকেই আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে সবচেয়ে বেশি, যা ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

পরিসংখ্যান যা বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ছিল ৮৯৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে প্রায় ৭০ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

আমদানি প্রবৃদ্ধির এই হার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের চেয়েও বেশি। চীন থেকে আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে, তৃতীয় বৃহত্তম উৎস যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি কমেছে ১৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।

রাজনৈতিক উত্তেজনা বনাম বাণিজ্যিক বাস্তবতা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরে। সীমান্তে উত্তেজনা, ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সীমিতকরণ এবং বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক ও অশুল্ক বাধার কারণে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। এর মধ্যে এনবিআর কর্তৃক স্থলবন্দরে সুতা আমদানি বন্ধ এবং ভারতীয় পণ্য বর্জনের সামাজিক ডাকও ছিল বেশ জোরালো।

কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, এই টানাপড়েন বাণিজ্যের নিজস্ব গতিতে খুব একটা বাধা হতে পারেনি। বরং চাল, পেঁয়াজ, আলুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং শিল্প কাঁচামালের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভারত থেকে সরকারি কেনাকাটা বা জি-টু-জি পদ্ধতিতে পণ্য আমদানি এই প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টিকে বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “অর্থনীতি তার নিজস্ব গতিতে চলে। আমদানিকারকরা সেখান থেকেই পণ্য আনেন যেখানে খরচ এবং সময় (লিড টাইম) কম লাগে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত থেকে পণ্য আনতে পরিবহন খরচ ও সময় দুটোই সাশ্রয় হয়। রাজনৈতিক টানাপড়েন থাকলেও যতক্ষণ পর্যন্ত সস্তায় আমদানি সম্ভব, ততক্ষণ ব্যবসায়ীরা সে পথেই হাঁটবেন।”

ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজনৈতিক দূরত্বের কারণে রফতানি বাণিজ্যে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও আমদানিতে ভারতই এখনো সবচেয়ে সাশ্রয়ী উৎস। ইন্ডিয়া বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (আইবিসিসিআই) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, “পরিবহন খরচ কম হওয়ায় ভারত থেকে আমদানি কার্যক্রম এখনো সচল আছে। সরকার চালসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির অনুমোদন দেওয়ায় এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।”

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে এবং মে মাসে স্থলবন্দর দিয়ে বেশ কিছু পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে। এতসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কমানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *